Open site navigation

অন্তর - view পর্ব-১


প্রথমেই অসংখ্য ধন্যবাদ তোমায় আমাদের সাথে এই আড্ডায় সামিল হবার জন্যে, তোমাকে প্রথম পর্বে অতিথি হিসেবে পেয়ে সত্যিই আনন্দিত । সায়ন : ধন্যবাদ তোমাকেও । ইন্টারভিউ শুরু করবার আগেই তোমার সাথে হলিউড সিনেমা নিয়ে কিছু আলোচনা হচ্ছিল, সেই প্রসঙ্গেই প্রথম প্রশ্ন করি, হলিউডে কোন কোন অভিনেতাকে তোমার ভালো লাগে ? সায়ন : হলিউডে ভালো লাগার অনেকেই আছেন , আর্নল্ড, দি ক্যাপ্রিও, টম ক্রুজ, স্মিথ, হ্যাঙ্কস, এনাদের কাজ ভালো লাগে; তবে আমি হলিউড সিনেমা খুব একটা দেখি না আর, অ্যানিমেশন বা সুপারহিরো ফিল্ম তো দেখিই না । আমার কাছে স্পাইডার ম্যান এর থেকে গুপি বাঘাকে বেশি ভালো সুপারহিরো বলে মনে হয় । হ্যাঁ ঠিক ই বলেছ, হয়ত স্পাইডার ম্যানের মতন পরিকাঠামো পেলে গুপি বাঘা আরো বেশি জনপ্রিয়তা পেতো । তবে হঠাৎ এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিলে ? হলিউডে শাটার আইল্যান্ড বা দি আইরিশ ম্যানের মতন কিছু দুর্দান্ত সিনেমাও তো রয়েছে ! সায়ন : আসলে আমি একটু বেশিই বাংলা ভাষা প্রেমী, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের যে ভান্ডার রয়েছে, তাই আর বলিউড বা হলিউড সেভাবে আমায় টানেনা । আমি এখন অনেকটাই বাস্তবধর্মী তত্ত্বে বিশ্বাসী, আমার দেশের বা রাজ্যের অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতিকে তুলে ধরে যে ছবি বা গল্প লেখা হয়, সেটাই বেশি ভালো লাগে, সময়ের সাথে প্রেফারেন্স বদলেছে । তবে কিছু কিছু ভালো শিক্ষা যেগুলো বাইরে থেকে পাওয়া যায়, সেগুলো নেবার চেষ্টা করি । আমি শুধুমাত্র বাংলা ভাষায়, বাংলায় থেকে যেটুকু সম্পদ পাবো, সেটুকু কাজ করতে চাই । খাঁটি কথা বলেছো, তবে বাইরে থেকে আজ তোমার কাছে যদি কোনো কাজের সুযোগ থাকতো তুমি করতে না ? এছাড়াও এক জনপ্রিয় OTT প্ল্যাটফর্ম থেকেও তোমার কাছে কাজের সুযোগ এসেছিল ! সায়ন : না, করিনি তো ! ২০১৬ সালে মুম্বাইতে কাজ পেয়েছিলাম, আমার একজন পরিচিত বন্ধুর সূত্রে । Web এর কাজটা ডিলে হয়েছে একটু, প্রোডিউসারের রেসপন্স পাওয়া যায়নি । আসলে মুম্বাই তে গেলে আমি আমার theatre, আমার কালচার, সবটাই মিস করতাম, ওটা আমি পারবোনা বলেই যাইনি । খারাপ বলোনি । আচ্ছা তুমি নিজেকে কোন ক্ষেত্রে বেশি নম্বর দেবে ? লেখক সায়ন ঘটক, অভিনেতা সায়ন ঘটক, না পরিচালক সায়ন ঘটক ? সায়ন : থিংকার সায়ন ঘটক । পরিচালনা, অভিনয় বা লেখা, তিনটিই চিন্তার ওপর ভিত্তি করে হয়, তাই আমি নম্বর দেবো আমার থিংকিং কে । ভাবতে পারি বলেই তো কাজ গুলো করতে পারি, থিংকিং হচ্ছে আমার মেইন ইনপুট, যার আউটপুট হচ্ছে পরিচালনা, অভিনয় বা আমার লেখা । ওগুলো আমি দেখতে পাই না, ওগুলো যারা আমার কাজ দেখবে তারাই বলবে । আমি শুধু আমার ভাবনা পর্যন্ত নিজেকে চিনি। দারুন একটা উত্তর দিলে ! ধরো তোমার নিজের কাজকে, থিয়েটার বা শর্ট ফিল্ম দু ক্ষেত্রেই, সেখানে তুমি কোন কাজ দুটিকে এগিয়ে রাখবে ? সায়ন : থিয়েটার প্রশেনিয়াম এ "আন্তিগোনে", ইন্টিমেট "ছেড়া প্রেমের কাব্য", শ্রুতি নাটক "মাংস" এবং শর্ট ফিল্ম এ "ভাত" । তবে ভাবনায় এগিয়ে থাকবে "অব্যক্ত", তবে ওই পরিকাঠামোর অভাবে কাজটা একটু Amateurish হয়েছে, তবে ওরকম ভাবনা আমার সবসময় ভাবা সম্ভব নয় । বেশ, আমি নিজে তোমার সব কাজই দেখেছি এবং প্রত্যেকটি অসাধারণ, এবং অব্যক্তর ক্ষেত্রে আমি তোমার সাথে একমত । আচ্ছা, তোমার নাটককে ভালোবাসার পেছনে কি কোনো ঘটনা বা কারণ লুকিয়ে আছে নাকি এটি সময়ের সাথে সাথেই আরো দৃঢ় হয়েছে ? সায়ন : বাবার সঙ্গে নাটকের গ্রুপে যেতে যেতে, নাটককে ভালো লাগতে শুরু করলো, তারপর দেখলাম ক্রিকেট বা ফুটবল খেলে যে আনন্দ হচ্ছে, নাটক করেও সেই আনন্দই হচ্ছে, ফলে একটা ভালোবাসা তৈরি হলো, একটা সময় দেখলাম, স্টেজ এ উঠলেই একটা আলাদা অনুভূতি হতো, ফলে আস্তে আস্তে একেবারেই ভালোবেসে ফেললাম । আচ্ছা তাহলে যদি তোমার জীবনে নাটকের প্রভাব না থাকতো, তবে তুমি তোমার কেরিয়ার হিসেবে কি বেছে নিতে ? সায়ন : জার্নালিজম, ক্লাস এইট থেকেই ঠিক করেছিলাম এটি নিয়ে পড়বো এবং আমি কলেজ ভর্তি হবার থেকেই বুঝতে পারতাম যে জার্নালিজম কতটা ভালো, তখন হয়ত টেকনিক্যাল টার্মস জানতাম না অনেক, কিন্তু জ্ঞান টা ছিল । খবর দেখে দেখে পেপার পড়ে পড়ে জ্ঞান টা ছিল বলেই মাধ্যমিকে এভারেজ নম্বর পেয়েও কলেজে ফার্স্ট হয়েছি । জার্নালিজম নিয়ে তোমার এই জ্ঞান বা সাফল্য কি কোনোভাবে থিয়েটার এ তোমায় সাহায্য করেছে ? সায়ন : দ্যাখো জার্নালিজম ও আসলে একটি শিল্প, এবং থিয়েটার ও একটি শিল্প, সেক্ষেত্রে দেখতে গেলে আমি আমার জীবনে একে অন্যের সাহায্য অবশ্যই হয়েছে, তবে থিয়েটার এর জন্য জার্নালিজম একটু বেশিই সাহায্য নিয়েছে । এক্ষেত্রে একটা কথা বলে রাখি, আমি জার্নালিজম এ যে পাশ করেছিলাম, সেক্ষেত্রে রূপম (রূপম ইসলাম) দার ও অবদান রয়েছে । এই বিষয়ে যদি একটু বিস্তারিত বলো... সায়ন : রূপম দা অসম্ভব ভালো জার্নাল লেখেন, লেখার ভাষা, আঙ্গিক, এতটাই ভালো এবং ঝরঝরে যে মানুষের পড়তে ভালো লাগে । আমি আগে ভালো লিখতে পারতাম না, লেখায় অনেক জড়তা ছিল, তবে রূপম দার লেখা পড়তে পড়তে সেটা হঠাৎ ই পাল্টে গেলো । এক্ষেত্রে বলে রাখি তোমার লেখাও আমাকে অনেকভাবে অনুপ্রাণিত করে ! এবার যদি একটু অফ বিট যাই, হবে ৩৭৭ সম্পর্কে তোমার কি মতামত ? সায়ন : বেশ, এক্ষেত্রে আমার মতামত খুব সোজা, ৩৭৭, এই সংখ্যার ই প্রয়োজন নেই ! মানুষ হচ্ছে জীব জগতের অঙ্গ, সে যাকে ইচ্ছে ভালোবাসতে পারে, তার সাথে থাকতে পারে, সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, গাছ হোক, পুকুর হোক, বাড়ি হোক কিংবা মেঘ হোক, ভালোবাসার জন্য যদি আইন তৈরি হয়, তাহলে পৃথিবীর কোনো বিকাশ নেই । হক কথা, এই জিনিসটা নিয়ে ফিল্ম জগতে অনেক হিপোক্রেসি দেখা যায়... সায়ন : সেসব থাকবেই, তবে আধুনিক সভ্যতার থেকে প্রাচীন সভ্যতাই ভালো ছিল, মানুষ যত আধুনিক হয়েছে, ততো কূটবুদ্ধি কোরাপশন বেড়েছে । সেক্ষেত্রে কি কি বদল তুমি আনতে চাইবে ? যেটা আমাদের ভুল পথে যাওয়া থেকে আটকাবে ? সায়ন : পুরো সমাজ ব্যবস্থাই বদলাতে হবে, একদম শেষ থেকে শুরু । মানুষ প্রকৃতির সাথে থাকলে অনেক বেশি সুস্থ থাকবে, আমরা প্রতিনিয়ত অলস এবং আধুনিকতার বাজে দিকে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছি । অনেকক্ষেত্রে দেখতে পারি, মানুষ দুদিনের জন্য সমূদ্র জঙ্গল ঘুরতে যায়, আসলে এটা ঘুরতে যাওয়া নয় ! এটা রিলিফ পেতে যাওয়া, ডিরেক্ট প্রকৃতি ছাড়া কেউ রিলিফ দিতে পারবে না । বেশ, চিন্তা টা তোমার অনেকটাই সঠিক ! বদলটা সত্যিই প্রয়োজন । আচ্ছা, তোমার শুরুর জীবনে তোমার সবচেয়ে বড়ো অনুপ্রেরণা কে ছিল ? সায়ন : বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই জীবন শিখছি এবং অনেক ক্ষেত্রেই মতামত পাল্টে যাচ্ছে । বেশ ! আচ্ছা তুমি তোমার জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সহকর্মীদের হারিয়েছ, সেটা কি তোমার চিন্তাকে কোনোভাবে এফেক্ট করেছে ? সায়ন : সহকর্মী মানেই একটা বন্ডিং তৈরি হওয়া, সেক্ষেত্রে তাদের হারালে খারাপ লাগা থেকেই যায় ! তবে একটা বিষয় দেখতে হবে যে সহকর্মী আসলে সহকর্মী ছিল, নাকি তার পেছনে ছিল কোনো উদ্দেশ্য । মানুষ জেনুইন হলে খারাপ লাগবে, তবে না হলে একটা অভিজ্ঞতা হবে, যে আগামী দিনে কাকে কতটা ভরসা করা উচিত । বেশ । তুমি বিভিন্ন সময়ে তোমার বিভিন্ন কাজ দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছো, সেক্ষেত্রে তোমায় থিয়েটার এর কোন কাজ বা কোন নাটকটি তোমায় মুগ্ধ করে ? সায়ন : ইচ্ছেমত নাট্যদলের "বুদ্ধিজীবী" । বেশ, তুমি তোমার কম্পিটিটর হিসেবে কাউকে ভাবো ? এই নাট্য সমাজে ? সায়ন : আমি তো শিখছি, এখনো অনেক কিছু জানিনা, আমার সবাই শিক্ষক, কম্পিটিটর কেউ নেই... স্ট্রেট উত্তর ! বেশ, থিয়েটার এ আইডল ? সায়ন: উৎপল দত্ত । আমার ক্ষেত্রেও উনি সেরা । আচ্ছা নবকল্লোল বিষয়ে তোমার ভবিষ্যতে কি কি পরিকল্পনা রয়েছে ? সায়ন : সেরকম কোনো প্ল্যানিং নেই, আপাতত নাটক টা নিয়মিত করে যাবার চেষ্টা, নতুন নতুন ডিজাইন করে যাবার চেষ্টা, এটাই করে যাবো আমরা । করোনা এই মুহূর্তে একটা বড়ো বাধা সব ক্ষেত্রেই, অনলাইন থিয়েটার কে বিকল্প হিসেবে বেছে নিলে না কেনো ? অনেক দল ই এই উদ্যোগ নিয়েছে । সায়ন : থিয়েটার মানেই একজন মানুষের সাথে সরাসরি interaction, অনলাইন সেটা নেই, এমনিই মানুষ দিন দিন OTT প্রেমী হয়ে যাচ্ছে, অনলাইন থিয়েটার দেখানোটা অভ্যেস করতে চাইনা । বেশ, থিয়েটার নিয়ে এগোতে চায় যারা তাদের উদ্দেশ্যে কি বলবে ? সায়ন : থিয়েটার শুধু অভিনয় এর জায়গা নয়, থিয়েটার মানে একটা নাটকের জন্য প্রয়োজনীয় সবটা, তোমার মধ্যে যদি সেই ক্ষমতা থাকে, যে অভিনয় করবো, আবার সেট টাও লাগাবো, টিকিট বিক্রি করবো, তবেই থিয়েটার এ আসতে হবে, আর এখানে সবার কর্মসংস্থান এর ক্ষমতা নেই, তাই থিয়েটার এর পাশাপাশি জীবিকাও খুঁজে নিতে হবে । তোমায় অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সাথে আজকের এই আড্ডায় থাকার জন্য, অনেক কিছু শিখলাম অনেক কিছু জানলাম তোমার থেকে । শেষ করবার আগে যদি কিছু বলো, সায়ন : শেষ করবার আগে এটুকুই বলবো, কোনো কিছুই কখনও আসলে শেষ হয় না । জীবন যদি একটা মঞ্চ হয়, তবে একটা নাটক শেষ হলে আরেকটা নাটকের ভাবনা আসে, তাই জীবনে সবসময় নতুন শুরুর কথা ভাবা উচিত । জীবনে কখনও কিছু থেমে গেলে, কিছু শেষ হয়ে গেলেও আবার শুরু করা যায়, শেষ একটা শব্দ মাত্র । প্রত্যেকটি লাইনে উদ্যম দিল একটি অন্যরকম । অসংখ্য ধন্যবাদ তোমায়, আশা করি আগামী দিনে আবার এরকম একটি আড্ডায় তোমায় পাবো । সায়ন: অবশ্যই, ধন্যবাদ । Interview by Souptik Dey